দাঁড়ি ও সমাজ


তথাকথিত বর্তমান সমাজে অবহেলিত একটি নাম দাড়ি । একদিকে এটা যেমন অবহেলিত অন্যদিকে যারা এর অস্তিত্ব টিকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে তারাও সমাজে সমান ভাবে অবহেলিত । দাড়ি রাখার ব্যপারে বেশিরভাগ লোক অনীহা প্রকাশ করে । তবুও, এই অনীহা কাটিয়ে যারা দাড়ি রাখে সমাজে তাদের নানা ধরনের ঠাট্টা - বিদ্রুপ করা হয় । আসলে সমস্যাটা আমাদের না সমস্যাটা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার । যেই সমাজে যুবকরা দাড়ি রাখাকে কেবল ফ্যাশন ভাবে, সেই সমাজের ছোটরা দাড়িকে মর্যাদা দিবে কি করে?

একজন কিশোর যখন বুঝার বয়স থেকে দেখে আসে তার দাদা, বাবা কিংবা বড় ভাই মুখে দাঁড়ি রাখে না কিংবা রাখলেও ইসলামের বিধান অনুযায়ী না । ঠিক তেমনি যখন এই কিশোরটি যুবক বয়সে পদার্পন করবে তখন সেও বড়দের রীতিনীতি অনুসারে জীবন যাপন করবে । 

বাস্তব অভিজ্ঞতা

নিজের জীবনবৃত্তান্তের সাথে ঘটি যাওয়া দুটো ঘটনা বলি! 

ঘটনা ১ঃ 
তখন আমি ষষ্ঠ কিংবা সপ্তম শ্রেনিতে পড়ি । একদিন সেলুনে (পরিচিত দোকানে) চুল কাটতে গিয়েছিলাম । চুল কাঁটার এক পর্যায়ে দোকানদার মজাস্বরুপ বললো -
  ‘সেইভ করাইয়া দেই!’
উত্তরে আমি বললাম - “আল্লাহ বাঁচাইয়া রাখলে যখন দাড়ি উঠবে তখন!”

ঘটনা ২ঃ
তখন সম্ভবত আমি সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেনিতে পড়ি । ভিন্ন গ্রামে পরিচিত সেলুনে চুল কাটতে ছিলাম । তখন দোকানদার একই (ঘটনা ১) প্রশ্ন করলো । জবাবে তখন বলেছিলাম, 

“ইনশাআল্লাহ আর গুটি কয়েক বছর যাইতে দেন । তারপর থেকে শুরু করবো”। 

সমাজে দাঁড়ি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা

ঘটনা দুটো যে শুধু আমার ব্যক্তিজীবনে ঘটেছে এমনটা নয় । বেশিরভাগ কিশোরদের মস্তিষ্কে এমন ধারনা জন্মায় যে, দাড়ি একটু বড় হলেই সেটাকে কাটতে হবে । ইসলামের বিধান অনুযায়ী দাড়ি রাখা যে একটা নিয়ামতের বিষয় তা আদো কেউ জানতেও চায় না কিংবা জানলেও মানার কোনো আগ্রহ প্রকাশ করে না । দিনকে দিন ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কেউ ইসলামের বিধান অনুযায়ী দাড়ি রাখা শুরু করলে তাকে সবাই এমন নিয়তে দেখে যেনো সে ভিন্ন কোনো জগৎ থেকে আগত কোনো প্রানী । তাছাড়া একই সমাজে বসবাস করে আরো এক দল মানুষ । যারা দাড়িকে কেবল একটি ফ্যাশন হিসাবে জানে । তারা একেক সময়ে একেক স্টাইলে দাড়ি কাটে । নিজের ধর্মেও (ইসলাম) যে দাড়ি রাখার নিয়মকানুন আছে আদতে তাদের জানা আছে কিনা কেবল আল্লাহ পাক ভালো জানেন । গল্পের প্লট যে এখানেই সমাপ্ত এমনটাও না । 
সমাজে দেখা যায় আরো এক জনরার মানুষ যারা পবিত্র দিনগুলোতে সেইভ করার মতো জঘন্য কাজ করতে দ্বিধাবোধ করে না উল্টো আনন্দ সহ কারে কাজটি করে থাকে । তারা বিয়ের মতো পবিত্র কিংবা ঈদের মতো খুশির দিনে এই উৎসবগুলোকে উদ্দেশ্য করে দাড়ি পুরোপুরি কেটে আসে । আর সমাজের লোকদের মনোভাব টা এমন হয়ে গেছে যে, তারা এইসব জঘন্য কাজকে একদম সাধারণভাবে নেয় । আর এদের ভিতরেও আরেক প্রজাতির মানুষ আছে যারা যুবক বয়সে দাড়ি রাখাকে ভুল/অন্যায় হিসাবে চক্ষুপাত করে । আর এমনটা না যে, তারা দাড়ি না রাখাতেই সীমাবদ্ধ থাকে উল্টো যারা যুবক বয়স থেকে দাড়ি রাখে তাদেরকে কটু কথা বলতেও দ্বিধাবোধ করে না । 

    “আরে এই বয়সে দাড়ি রাখছোছ কিত্তি? মোল্লা হইয়া গেছোছ নাকি?”

দাড়ি সম্পৃক্ত কিছু প্রশ্ন

দাড়ি রাখা সুন্নত নাকি ওয়াজিব? 

= দাড়ি রাখা সুন্নত নাকি ওয়াজিব এই নিয়ে বেশ কিছু বিতর্ক রয়েছে । 
মূলত মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) তার জীবনে যা কর্ম করতেন সেগুলোই সুন্নাহ । সেই হিসাবে দাড়ি রাখা সুন্নত তাতে কোনো দ্বিধাবোধ নেই । 

তাহলে কি দাড়ি রাখা শুধু সুন্নাহ? 

হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) দাড়ি রাখার বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন । পবিত্র কোরআনে দাড়ি নিয়ে সরাসরি কোনো কথা বলা না থাকলেও রাসূলের মাধ্যমে অনেকবার এসেছে । 
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন,
  
  “ মুশরিকদের বিরোধিতা করো, দাড়ি লম্বা কর আর গোঁফ ছোট কর। ” [১]

আর পবিত্র কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়লা বলেন,

  “ রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহন কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর । নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদাতা ” [২]

তিনি আরোও বলেন,

  “ যে রাসুলের আনুগত্য করলো, সে আল্লাহরই আনুগত্য করলো ” [৩]

এইসব আয়াতগুলো দ্বারা বোঝানো হয়েছে রাসূলের কথা গুরুত্ব নিয়ে । তাছাড়া রাসূল দাড়ি রাখার জন্য অনেক তাগিদ দিয়েছে তাই অনেক আলেম ওয়াজিব বলে মনে করেন তাছাড়া রাসূলের সবকিছু যেহেতু আল্লাহর কাছ থেকেই আসে এজন্য অনেকে ফরজ বলেও মনে করেন । এই নিয়ে মত পার্থক্য থাকলেও গুটি সংখ্যক আলেম বাদে সবাই দাড়ি রাখাকে ওয়াজিব বলে মনে করেন । 

ইসলামের বিধান মতে কতোটুকু দাড়ি রাখতে হবে? 

= মহানবী (সাঃ) দাড়ি কেটেছেন বা ছোট করেছেন বলে কোনো সহীহ হাদিসের বর্ণনায় আসেনি । তবে, নবীজী অনেক সাহাবা বলেছেন যে তারা এক মুষ্টির অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন । 
এক মুষ্টির ব্যাপারে কোনে সহীহ হাদিস না থাকলেও অনেক জায়গাতেই এক মুষ্টিকে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে । 
হযরত আবু যুর'আ কর্তৃক বর্ণিত আছে যে,

‘ হযরত আবু হুরায়রা (রা.) দাড়ি হাতের মুঠোয় নিয়ে এর অতিরিক্ত ছেটে নিতেন ’ [৪]

অন্য এক হাদিসে আবু হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে,

“ তিনি নিজের দাড়ি হাতের মুঠোয় নিয়ে অবশিষ্ট নিয়ে অবশিষ্ট অংশ কর্তন করতেন ” [৫]

দাড়ি রাখা কিংবা বড় করার ব্যাপারে যেহেতু অনেক হাদিস পাওয়া যায় তাই বির্তকে না গিয়ে অন্তত এক মুষ্টি কিংবা তার বেশি দাড়ি রাখা যুক্তিযুক্ত ।                                       

দাড়ি না রাখার কুফল 

দাড়ি রাখার ব্যাপারে যেহেতু ইসলামের বিধানে বলা আছে সেহেতু কেউ যদি দাড়ি না রাখে তার মানে সে ইসলামের বিধান লঙ্ঘন করল । আর ইসলামের কোনো একটি বিধান লঙ্ঘন করে কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারে না । তাছাড়া আমাদের নবি দাড়ি রাখার ব্যাপারে জোরদার তাগিদ দিয়েছেন তার মানে কেউ দাড়ি না রাখলে সে রাসূলের পথ হতে বিচ্যুত হয়ে গেলো । আর রাসূলের দেখানো পথ ব্যতিত কেউ জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না । 
আল্লাহ তায়লা বলেন,

  “ যদি কেউ রাসূলের বিরুদ্ধাচারন করে তাহলে তার জায়গা হবে জাহান্নাম ” [৬]

তাছাড়া দাড়ি যেহেতু মুসলিমদের আলাদা একটি চিহ্ন তাই প্রত্যেকের উচিত এই নিয়ামতটি সাদরে গ্রহন করা      

দাড়ি রাখার সুফল

দাড়ি রাখলে যে শুধু আখিরাতে এর সুফল ভোগ করা যাবে এমনটা না । একে তো দাড়ি রাখলে নবি রাসূলদের সাদৃশ্য গ্রহন করা যায় এবং কিয়ামতের দিন নবিজির শাফায়াত লাভ করা যাবে তার ওপর দাড়ি রাখার অনেক বৈজ্ঞানিক উপকারিতা আছে । 

  •  দাড়ির অস্তিত্ব যৌন শক্তিকে বৃদ্ধি করে । 
  •  পাইরিয়ার মতো মারাত্মক রোগের জীবানু থেকে আরোগ্য পাওয়া যায় । 
  •  দাড়ি না কাটলে অর্থ অবচয় ও অহেতুক সময় রোধ করা যায় । 

জার্নাল অব হসপিটাল ইনফেকশনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে যাদের দাড়ি আছে তাদের থেকে যাদের দাড়ি নেই তাদের মুখে বেশি রোগ জীবাণু পাওয়া গিয়েছে । যার প্রধান কারন হচ্ছে দাড়ি কাটতে গিয়ে গালের চামড়ায় যে হালকা ঘষা লাগে ওইটাই ব্যাকটেরিয়ার বাসা বাঁধার যথাপোযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে । তাছাড়া বিসিবির টাস্ট মি, আই অ্যাম এ ডক্টর অনুষ্ঠানে দাড়ি থেকে ব্যাকটেরিয়া নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণা করা হয়েছিল । ডাঃ অ্যাডাম রবার্ট এই গবেষণার ফল দেখে বলেছেন দাড়িতে এমন কিছু  মাইক্রোব আছে, যা ব্যাকটেরিয়া নিশেষ করতে সাহায্য করে । 


সর্বশেষ দাড়ি রাখলে আমাদের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না বরং নবিজির একটি আদেশ মানতে পারছি এবং দুনিয়াতেও অনেক সুফল ভোগ করতে পারছি তার বিপরীতে দাড়ি না রাখলে দুনিয়াতে অনেক নিয়ামত মিস করছি সাথে আখিরাতে শাস্তি তো আছেই । তাছাড়া অনেকে বলেন ‘ দাড়ি রাখলে চাকরি থেকে বের করে দিচ্ছে ’ কিংবা ‘ পরিবার থেকে দাড়ি রাখতে দিচ্ছে না ’ তাদের জন্য দুটি উৎসাহ মূলক বার্তা দিয়ে আজকের অধ্যায় শেষ করছি । 

‘ পৃথিবীতে বিচরণশীল সকল প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালার ওপর ন্যস্ত। ’ [৭]

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সেই পবিত্র সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে পিতা ও সন্তানের চেয়ে বেশি প্রিয় হই। ’ [৮]

রেফারেন্সঃ
১. সহিহ বুখারী - ২/৮৭৫
২. সূরা হাশরঃ ৭
৩. সূরা নিসাঃ ৮০
৪. (ইবন আবী শায়বা -খন্ড ৮)
৫. নাছরুর রায়াহ
৬. সূরা নিসাঃ ১১৬
৭. (সূরা হুদ: আয়াত ৬)
৮. (বুখারী : হা. ১৩)